কবিতা গল্পবুড়ো - সুনির্মল বসু
কবি পরিচিতি : সুনির্মল বসু বাংলা সাহিত্যের এক স্মরণীয় শিশুসাহিত্যিক। ১৯০২ সালে বিহারের গিরিডিতে তাঁর জন্ম হয়। সাঁওতাল পরগনার মনোরম পরিবেশই তাঁর মনে কবিতা রচনার অনুপ্রেরণা জাগায়।
প্রধানত ছোটোদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, কাহিনি, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনি, রূপকথা, কৌতুক-নাটক প্রভৃতি সরস সাহিত্য তিনি রচনা করেছেন। তিনি ভালো ছবি আঁকতেও পারতেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল—হাওয়ার দোলা, ছানাবড়া, হইচই, বেড়ে মজা, ছন্দের টুংটাং, বীর শিকারী, কথাশেখা প্রভৃতি। তাঁর রচিত আত্মজীবনী ‘জীবনখাতার কয়েক পাতা' (১৯৫৫)। ১৯৫৬ সালে তিনি ‘ভুবনেশ্বরী’ পদক পান। তাঁর সম্পাদিত বই হল – 'ছোটদের চয়নিকা' ও 'ছোটদের গল্পসংকলন। “গল্পবুড়ো' কবিতাটি 'সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা' থেকে নেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।
কবিতা পরিচয় : একজন বুড়ো মানুষ ভোরবেলা তার থলেতে করে হরেকরকম গল্পের পসরা নিয়ে বেরিয়ে ছোটোদের ডাক দিয়ে পথ চলেন। তিনি বলেন তাঁর থলেতে রয়েছে রূপকথার গল্প। তাই তিনি সবাইকে শোনান। তাই কবিতাটির গল্পবুড়ো নামকরণ সার্থক।
সারমর্ম: এক থুথুড়ে বুড়ো শীতের সকালে খুব দ্রুত পথ ধরে হেঁটে চলেছে এবং চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে রূপকথা চাই রূপকথা। সেই বুড়ো ছোটো ছোটো ছেলেদের ঘুম থেকে ওঠার জন্য হাঁক ছেড়ে ডাকছে এবং তার তল্পিতে কী আছে তা দেখতে আসতে বলেছে। বুড়োটি বলছে তার কাঁধের ঝোলাতে রয়েছে মনভরানো গল্প। পক্ষীরাজ, রাজপুত্তুর, দত্যি, দানো, , যক্ষিরাজ মনপবনের দাঁড় সহ সব আজগুবি কারখানায় তার ঝুলি ভরে আছে।
তার এই তল্পিটায় সার-বাঁধা কড়ির পাহাড়, চোখ বাঁধানো হীরা-মাণিক, ঝলমলে সোনার কাঠি, তেপান্তরের মাঠ, হট্টমেলার হাট, ময়নামতি নদী সবই রয়েছে। কেশবতী নন্দিনীও এই থলেতেই বন্দি রয়েছে। যে এই সমস্ত দেখার জন্য এই প্রবল শীতের ভোরে উঠে আসবে না সে শত্রু। গল্পবুড়ো তাদের মূর্খতা ভাঙবে এবং তাদের রূপকথা শোনাবে না।
⬛ সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো : প্রতিটা প্রশ্নের মান -1
1. চলছে হেঁটে পথ ধরে — (শীতের/ গ্রীষ্মের/বর্ষার) ভোরে সত্বরে।
উঃ। শীতের।
2. আয়রে ছুটে (বড়রা/মেজোরা/ ছোট্টরা)।
উঃ। ছোট্টরা।
3. পোনার কাঠি—(ঝকমকে/ঝলমলে/ ঝিকিমিকি)।
উঃ। ঝলমলে।
4. ভাঙব তাদের মূর্খতা বলব নাকো – (গল্পকথা/ সবকথা/রূপকথা)।
উঃ। রূপকথা ৷
5. 'প্রত্যুষ' শব্দটির অর্থ (সন্ধ্যা/সকাল/ভোর)।
উঃ। ভোর।
6.চেঁচিয়ে যে তার (গলা/মুখ/চোয়াল) ব্যাথা।
উঃ। মুখ।
⬛ বাক্য বাড়াও : প্রতিটা প্রশ্নের মান -1
1. চলছে হেঁটে পথ ধরে (কে চলছে?
উঃ। গল্পবুড়ো পথ ধরে হেঁটে চলেছে।
2. ঘুম ছেড়ে আজ ওঠ তোরা' (কারা উঠবে?)
উঃ। ছোট্টরা ঘুম ছেড়ে উঠবে।
3. বলছে ডেকে (কীভাবে ডেকে বলছে?
উঃ। হাঁক ছেড়ে ডেকে বলছে।
4. পাহাড় সার-বাঁধা (কীসের পাহাড় ?)
উঃ। কড়ির পাহাড় সার-বাঁধা।
5.শীতের প্রত্যুষে (কেমন প্রত্যুষ ?)
উঃ। শীতের প্রখর প্রত্যুষ।
6. এই থলেতে বন্দিনী। (কে বন্দিনী)
উঃ। কেশবতী নন্দিনী এই থলেতে বন্দিনী।
⬛অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর : প্রতিটা প্রশ্নের মান -1
১. গল্পবুড়ো কখন হেঁটে চলেছে?
উঃ। গল্পবুড়ো শীতের ভোরে পথ ধরে হেঁটে চলেছে।
২. গল্পবুড়ো চেঁচিয়ে কী বলছে?
উঃ। গল্পবুড়ো চেঁচিয়ে ছোটোদের বলছে রূপকথা চাই।
৩: হাওয়া কোনদিক থেকে বইছে?
উঃ। হাওয়া উত্তর দিক থেকে বইছে।
৪. গল্পবুড়ো কী নিয়ে এসেছে?
উঃ! গল্পবুড়ো রূপকথা নিয়ে এসেছে।
৫. সে ছোটোদের কী দেখতে আসতে বলছে?
উঃ। সে ছোটোদের তার ভগ্নি দেখতে আসতে বলছে।
৬. গল্পবুড়োর কাঁধে কী আছে?
উঃ। গল্পবুড়োর কাঁধের উপর ঝোলা আছে।
৭. গল্পবুড়োর তল্পিতে কী রয়েছে?
উঃ। তার তল্লিতে দত্যি-দানব, যক্ষিরাজ, রাজপুত্তুর, পক্ষীরাজ, প্রভৃতি আছে।
৮. কড়ির পাহাড় কীভাবে রয়েছে?
উঃ। কড়ির পাহাড় সার বাঁধা হয়ে রয়েছে।
৯. এখানে ময়নামতী কী?
উঃ। ময়নামতী একটি টলটলে জলে ভরা দীঘি।
১০. কোথাকার হাট গল্পবুড়োর তরিতে আটকে গেছে?
উঃ। হট্টমেলার হাট গল্পবুড়োর তরিতে আটকে গেছে।
১১. গল্পবুড়োর থলিতে কে বন্দিনী হয়ে রয়েছে?
উঃ। কেশবতী নন্দিনী গল্পবুড়োর থলেতে বন্দিনী হয়ে রয়েছে।
১২. এখানে 'চোখ ধাঁধা' কেন বলা হয়েছে?
উঃ। কবিতায় মানিক ও হীরা বহুমূল্য রত্ন তাদের উজ্জ্বলতায় চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
১৩. কারা শত্রু হয়ে যাবে?
উঃ। যে গল্পবুড়োর ডাকে এই শীতের ভোরে আসবে না সে শত্রু হয়ে যাবে।
১৪. গল্পবুড়ো শত্রুদের সাথে কী করবে?
উঃ। গল্পবুড়ো শত্রুদের মূর্খতা ভাঙবে ও তাদের রূপকথা বলবে না।
১৫. সুনির্মল বসুর লেখা দুটি বইয়ের নাম লেখো ?
উঃ। ছানা বড়া, হইচই।
১৬. ‘গল্পবুড়ো' কবিতায় 'ঝলমলে' কোন্ জিনিসটি ?
উঃ । কবিতায় 'ঝলমলে' জিনিসটি হল সোনার কাঠি।
১. গল্পবুড়ো কখন গল্প শোনাতে আসে ?
উঃ। গল্পবুড়ো শীতকালের ভোরবেলায় গল্প শোনাতে আসে।
২. গল্পবুড়োর ঝোলায় কী কী ধরনের গল্প রয়েছে?
উঃ। গল্পবুড়োর ঝোলাতে দত্যি-দানব, যক্ষিরাজ, রাজপুত্তুর, পক্ষীরাজ, কেশবতী রাজকন্যার গল্প রয়েছে।
৩. গল্পবুড়ো শীতকালের ভোরে ছোটোদের কীভাবে ঘুম থেকে ওঠাতে চায় ?
উঃ। গল্পবুড়ো হাঁক দিয়ে ডেকে, লোভনীয় গল্পের কথা বলে ছোটোদের শীতকালের ভোরে ঘুম থেকে ওঠাতে চায়।
৪. ‘রূপকথা’র কোন্ কোন্ বিষয় কবিতাটিতে রয়েছে?
উঃ। পক্ষীরাজ, যক্ষিরাজ, রাজপুত্তুর, দত্যি-দানব, তেপান্তরের মাঠ, হট্টমেলার হাট, কেশবতী রাজকন্যা, সার বাঁধা কড়ির পাহাড়, চোখ ধাঁধানো হীরা-মানিক, ঝলমলে সোনার কাঠি, ময়নামতীর টলটলে জল প্রভৃতি রূপকথার বিষয় কবিতাটিতে রয়েছে।
৫. গল্পবুড়ো কাদের তার গল্প শোনাবে না ? -
উঃ। যেসব ছেলে এই প্রবল শীতের ভোরে, ঘুমের অলসতা ছেড়ে উঠে আসবে না, গল্পবুড়ো তাদেরকে তার গল্প শোনাবে না ।
⬛ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর : প্রতিটা প্রশ্নের মান -2/3
1. গল্পবুড়ো কাদের কীভাবে ডেকে কী বলছে?
উঃ। শীতের ভোরে গল্পবুড়ো হাঁক ছেড়ে ছোটোদের ডাকছে। ডাক ছেড়ে সে ছোটোদের ঘুম ছেড়ে তাড়াতাড়ি ছুটে আসতে বলছে এবং তার তরি বা ঝোলাটায় কী আছে তা দেখতে বলছে।
2. গল্পবুড়ো কখন কী বলতে বলতে হেঁটে চলেছে?
উঃ। শীতের ভোরে যখন উত্তুরে হাওয়া বইছে সেই সময় থুথুড়ে এক গল্পবুড়ো চেঁচিয়ে মুখ ব্যথা করে ‘রূপকথা চাই রূপকথা' বলতে বলতে তাড়াতাড়ি হেঁটে চলেছে।
3. গল্পবুড়োর তল্পিতে আর কী কী আটকে আছে?
উঃ। সার-বাঁধা কড়ির পাহাড়, চোখ ধাঁধানো হীরা-মাণিক, ঝলমলে সোনার কাঠি, ময়নামতী দিঘির টলটলে জল এবং তেপান্তরের মাঠ ও হট্টমেলার হাট সবই গল্পবুড়োর -ঝোলায় আটকে আছে। কেশবতী নন্দিনী অর্থাৎ রাজকন্যাও তার থলেতে বন্দিনী হয়ে রয়েছে।
4. গল্পবুড়োর কাঁধের ঝোলায় কী কী গল্প ভরা আছে?
উঃ। গল্পবুড়োর কাঁধের ঝোলা বা তল্পিটায় অনেক মন ভোলানো গল্প ভরা আছে। যার মধ্যে দত্যি, দানব, যক্ষিরাজ, রাজপুত্তুর এর কথা এবং পক্ষীরাজ ও মনপবনের দাঁড়ের আজগুবি সব কারখানার কাহিনি ভর্তি হয়ে রয়েছে।
5. ‘তেপান্তরের মাঠখানা'—রূপকথার গল্পে এই মাঠের কথা কীভাবে পাওয়া যায় নিজের ভাষায় লেখো।
উঃ। রূপকথার গল্পে আমরা এক জনহীন বিশাল প্রান্তর বা মাঠের কথা পাই যা তেপান্তরের মাঠ নামে পরিচিত। গল্পে এই মাঠটির এপার ওপার দেখা যায় না। এই সুবিশাল মাঠটিতে দিনের বেলাতেই গা ছমছম করে। সেখানে গরম হাওয়ার ঘূর্ণি পাক খায়। আরও দেখা যায় মাঠটিতে এখানে ওখানে বড়ো বড়ো গাছ রয়েছে যার নীচে রাজপুত্র বা গল্পের নায়ক বিশ্রাম করে। সেই গাছটির ওপর সাধারণত ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী পাখি বাসা বেঁধে থাকে। কোনো গল্পে এই মাঠে পথ হারিয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে জানা যায়। তবে রূপকথার গল্পে এই মাঠ পেরোলেই পাওয়া যায় রাজবাড়ি বা রাক্ষসপুরী অথবা বড়ো জলাশয় যেখানে থাকে রাক্ষসের প্রাণভোমরা। ঘুমন্ত রাজকন্যাও অনেক সময় এইসব রাক্ষসপুরীতে বন্দিনী হয়ে থাকে। যাকে রাজপুত্র এসে উদ্ধার করে।
6. 'রূপকথা' কী?
উঃ। বাংলা শিশু সাহিত্যে এক কল্পনার জগতের কাহিনি হল রূপকথা। এই জগতে রাজপুত্র, রাজকন্যা, রাজা-রানী, মন্ত্রী-সেপাই ছাড়াও এমন কিছু জীবের বর্ণনা আমরা পাই যাদের বাস্তবে দেখা যায় না। যেমন—রাক্ষস-রাক্ষসী, দৈত্য, পরি, ডাইনি, পক্ষীরাজ ঘোড়া, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, পাখি প্রভৃতি।
7. তোমার পড়া অথবা শোনা একটি রূপকথার গল্প নিজের ভাষায় লেখো।
উঃ। অনেকদিন আগে এক দেশে এক রাজা ছিলেন। তার বিরাট রাজপ্রাসাদ, অনেক দাস-দাসী, হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। রাজার ছিল রানি ও একটা ছোট্ট সুন্দর ফুটফুটে রাজকন্যা। এইভাবে তো সেই রাজার বেশ আনন্দে দিন কাটছিল। এমন সময় হঠাৎ পাশের দেশের রাজা সেই দেশ আক্রমণ করায় রাজা রাজকন্যা ও রানিকে সাবধানে থাকতে বলে অনেক দূরে যুদ্ধ করতে গেলেন ।
সেই নগরের শেষে এক পাহাড়ে এক রাক্ষস থাকত। সে ছদ্মবেশ ধরে মানুষ সেজে নগরে আসত আর খালি ভাবত কীভাবে রাজকন্যাকে চুরি করা যায়। কিন্তু রাজা থাকায় তার সুযোগ হত না। এইবার সে দেখল এইবার খুব ভালো সুযোগ এসেছে। সে অপেক্ষা করতে থাকল একলা রাজকন্যাকে পাওয়ার জন্য। একদিন রাতে রাজকন্যা একা রাজবাড়ির ছাদে নিয়ে গেল। দাঁড়িয়ে আছে। রাক্ষস সেই সুযোগে এক বিরাট পাখির রূপ ধরে রাজকন্যাকে নিয়ে উড়ে গেল। -
চারদিকে খোঁজ পড়ে গেল। রানি মেয়ের শোকে জ্ঞান হারালেন। রাজা খবর পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছুটে এলেন। কিন্তু কোথাও রাজকন্যাকে পাওয়া গেল না। শেষে উপায় না দেখে রাজা ঘোষণা করলেন—যে তার মেয়ের সন্ধান দিতে পারবে তার সাথে বা তার ছেলের সাথে তিনি নিজের মেয়ের বিয়ে দেবেন।
সেই রাজ্যে এক গরিব ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন। তার একটি ছেলে ছিল। ছেলেটি অত্যন্ত ভালো। সে খুব পরিশ্রম করত এবং বাবা-মায়ের সেবা করত। সেই ব্রাহ্মণটি খুব ভালো হাত গুনতে জানতেন। ব্রাহ্মণটি একদিন রাজার কাছে গিয়ে বললেন তার গুণের কথা। রাজা সাগ্রহে রাজি হলেন। তার যা যা জিনিস দরকার সব আনিয়ে দিলেন। ব্রাহ্মণ এরপর তার বিদ্যা প্রয়োগ করলেন এবং রাজাকে বললেন যে তার মেয়েকে রাক্ষস সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে, তেপান্তরের মাঠ ছাড়িয়ে এক পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে রেখেছে। রাজা তৎক্ষণাৎ সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
সেই গুহায় পৌঁছতে বছর পেরিয়ে গেল। তিনি গুহায় পৌঁছে রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাক্ষসকে মেরে রাজকন্যাকে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর কথামতো ব্রাহ্মণের ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন। সাত দিন, সাত রাত ধরে অনুষ্ঠান চলল। তারপর তারা সবাই মিলে সুখে শান্তিতে রাজপ্রাসাদে বসবাস করতে লাগলেন।
No comments:
Post a Comment